1. admin@ritekrishi.com : ritekrishi :
  2. ritekrishi@gmail.com : ritekrishi01 :
প্রেরণার উৎস মায়ারানী - Rite Krishi
বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ন

প্রেরণার উৎস মায়ারানী

  • আপডেটের সময় : শনিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২২
  • ৯১ পড়া হয়েছে

বাড়ির ফটকে নাম লেখা ‘মায়ারানী বাউল’। তবে তিনি গান করেন না। কৃষিকাজ করেন। গরু পোষেন। যেনতেন প্রকারে নয়, একটি বাছুর থেকে এখন তাঁর খামারে গরুর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। আবাদ করছেন ৩০ বিঘা জমিতে। মায়ারানী বলেন, ‘আমি শিল্পী বাউল না। বাউল আমাদের পরিবারের পদবি। আমি আসলে কৃষক।’

ঢাকার নবাবগঞ্জের এই নারী কৃষক ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারে’ সেরা কৃষক হিসেবে দুবার পদক পেয়েছেন—২০১৭ সালে ব্রোঞ্জ ও ২০২১ সালে স্বর্ণ। তাঁকে দেখে গ্রামের প্রায় পাঁচ শ নারী কৃষিকাজ করছেন। বাড়িতে গবাদিপশু পালন করছেন অনেকে। তাঁদের গ্রামটিকে এখন অনেকেই বলেন, নারী কৃষকের গ্রাম। মায়ারানী তাঁদের প্রেরণার উৎস। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফারজানা জাহানের কথায়, মায়ারানী তাঁর যোগ্যতা দিয়েই জাতীয় স্বর্ণপদক বিজয়ী হয়েছেন।

মায়ারানী বাউলের বাড়ি নবাবগঞ্জ উপজেলার বাহ্রা ইউনিয়নের কান্দামাত্রা গ্রামে। নবাবগঞ্জ সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পূর্ব দিকে। পিচঢালা প্রধান সড়ক থেকে দক্ষিণ দিকে ইটপাতা পথ নেমে গেছে আম, কাঁঠাল আর বাঁশঝাড়ের তলা দিয়ে। মাঝে মাঝে অনেক ইট নিখোঁজ হওয়ায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে পুরো পথটি। সেই পথ ধরেই সম্প্রতি এক বিকেলে মায়ারানী বাউলের বাড়িতে যাওয়া।

নবাবগঞ্জ এলাকার ঐতিহ্যবাহী আদি বাড়িগুলোর মতোই মায়ারানীর বাড়িও টিনের। বাড়ির এক প্রান্তে থাকার ঘর, অন্যদিকে পরপর সাতটি টিনের দোচালা ছাউনি। মেঝে পাকা করা। চারপাশে বুকসমান উঁচু ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এখানেই থাকে মায়ারানীর গরুগুলো।

আসলে পরিকল্পনা করে কোনো কিছু করিনি। গরুর সংখ্যা বেড়েছে, একটি করে শেড বাড়িয়েছি। জমিও একটু একটু করে বেড়েছে। এভাবেই চলতে থাকবে। আমাদের গ্রামে এখন পাঁচ শতাধিক নারী কৃষিকাজ করছেন। অনেকেই বলে এটা নারী কৃষকের গ্রাম। এতে আমার কিছু অবদান আছে। আগে আমি পরামর্শের জন্য মানুষের কাছে যেতাম, এখন অনেক মানুষ আমার পরামর্শ নিতে আসে। এটাই আমার ভালো লাগে
মায়ারানী বাউল

এখন আছে ছোট–বড় মিলিয়ে আছে ৫০টি। গত ঈদুল আজহায় বিক্রি করেছেন আটটি। তাতে ১৪ লাখ টাকার মতো এসেছে। এখন রোজ ১০০ লিটারের বেশি দুধ হয়। প্রতি লিটার ৭০ টাকা। কিন্তু রোজ গরুর খাবার জোগাতেই প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। গরুর পরিচর্যার জন্য পাঁচজন লোক কাজ করেন। তাঁদের বেতন ১২ হাজার টাকা করে মাসে ৬০ হাজার টাকা।

ফলে দুধ বিক্রি করে গরুর খামারে বিশেষ লাভ হয় না। মায়ারানী জানান, এখন দানাদার খাবারের দাম বেড়েই চলেছে। ঘাসের দামও বাড়ছে। প্রতিবছর যে বাছুরগুলো জন্মে আর কোরবানির জন্য কিছু ষাঁড় মোটাতাজা করাই এখন গরুর খামারের লাভ। একসময় তাঁর খামারে গরু এক শ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। খরচ বেশি হওয়ায় কমিয়ে এনেছেন।

প্রথমে কৃষি, এরপর গরুর খামার
মায়ারানীর গল্পটি বেশ আকর্ষণীয়। তাঁর স্বামী জগদীশ চন্দ্র বাউল পেশায় পল্লিচিকিৎসক। নবাবগঞ্জ বাজারে তাঁর ডিসপেনসারি। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি প্রায় ২০ বিঘা জমি পেয়েছিলেন। কৃষিকাজে তাঁর আগ্রহ নেই। বর্গা, বন্দোবস্ত এসব ব্যবস্থায় দেওয়া ছিল।

তবে মায়ারানীর গভীর মায়া–মমতা ছিল চাষাবাদে। প্রথম দিকে বাড়ির চারপাশে তিনি শাকসবজি বুনতে শুরু করেন। বেশ ভালো ফলন হলো। উৎসাহ পেলেন। তাঁদের ফসলি জমিগুলোও বাড়ির সীমানা লাগোয়া। সেখানে তিনি নানা রকম সবজি চাষ করলেন। এতেও ফলন হলো চমৎকার। আগ্রহ আরও বাড়ল। ধীরে ধীরে তাঁদের সব জমিতেই তিনি নিজ উদ্যোগে নানা রকমের সবজি ও দানাদার ফসলের আবাদ শুরু করলেন। মায়ারানীর আয় বাড়তে থাকল।

গরুর খামার সম্পর্কে মায়ারানী জানালেন, এখন আগের মতো লাভ নেই। দানাদার খাবারের প্রচুর দাম। তাঁর সুবিধা হলো, নিজের জমিতে ঘাস ও ভুট্টার চাষ করেন। এগুলোই গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তা ছাড়া তাঁর কর্মীরা একই সঙ্গে মাঠের কৃষিকাজে এবং গরুর খামারেও কাজ করেন।

এর মধ্যে ২০০৯ সালের একটি ঘটনা ঘটল। সে বছর দাপ্তরিক কাজে তাঁদের গ্রামে এসেছিলেন নবাবগঞ্জ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ওলিউল্লাহ। তিনি মায়ারানীর বাড়িতে এসে তাঁর চাষাবাদ দেখে মুগ্ধ হলেন। বললেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে চাষাবাদ করলে মায়ারানী আরও ভালো করবেন। মায়ারানী কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাদের সহায়তা নিয়ে চাষাবাদ শুরু করলেন। এল সাফল্য।

মায়ারানী জানালেন, প্রতিবছর প্রায় ৫০০ মণ আমন ধান পান। ভুট্টার ফলন পান প্রায় ৬০০ মণ, শর্ষে হয় ১০০ থেকে ১২৫ মণ। দানাদার ফসল করেন এই তিনটিই। সারা বছর করলা, ডাঁটা, বরবটি, শিম এমন নানা ধরনের সবজি হয় প্রচুর। এ ছাড়া তিন থেকে পাঁচ বিঘায় নেপিয়ার ঘাসের চাষ করেন। জমি কিনেছেন ১০ বিঘা। সব মিলিয়ে তাঁর জমি এখন ৩০ বিঘার মতো।

চাষাবাদের পাশাপাশি ২০১৪ সালে মায়ারানী গরু পালন করবেন বলে ভাবলেন। প্রথমে শুরু করেছিলেন ৩৪ হাজার টাকা দিয়ে কেনা একটি সংকর জাতের বকনা বাছুর দিয়ে। তারপর দিনে দিনে বড় হলো গরুর খামার। তবে এ জন্য প্রচুর পরিশ্রম আর সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে থাকতে হয় তাঁকে।

মায়ারানী জানালেন, কৃষি ও পশুপালনে তাঁর সাফল্যের কথা লোকমুখেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একটা পর্যায়ে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে মায়ারানীর কৃষি ও গরুর খামারের সাফল্য নিয়ে প্রতিবেদন সম্প্রচারিত হয়। ২০১৭ সালে মায়ারানী ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার’–এ তৃতীয় হয়ে ব্রোঞ্জপদক পান। এতে তিনি আরও অনুপ্রাণিত হন।

মায়ারানী বাউলের সাফল্য সম্পর্কে নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাহিদুজ্জামান বলেন, তিনি (মায়ারানী) শুধু কৃষকই নন। তিনি একজন ভালো সংগঠক। এলাকার নারীদের কৃষি ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী করে তুলতে উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ওই গ্রামের প্রায় ৩০ জন নারীকে কৃষি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা করছেন তিনি। তাঁকে দেখে আরও অনেক নারী কৃষিতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

গরুর খামার সম্পর্কে মায়ারানী জানালেন, এখন আগের মতো লাভ নেই। দানাদার খাবারের প্রচুর দাম। তাঁর সুবিধা হলো, নিজের জমিতে ঘাস ও ভুট্টার চাষ করেন। এগুলোই গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তা ছাড়া তাঁর কর্মীরা একই সঙ্গে মাঠের কৃষিকাজে এবং গরুর খামারেও কাজ করেন। খামারের জন্য আলাদা কর্মী রাখতে হয়নি। শুধু গরুর খামার হলে টিকে থাকা কঠিন হতো। চাষের জন্য নিজেই পাওয়ারটিলার ও ভুট্টা ভাঙার মেশিন কিনেছেন। দুধ থেকে ননি তোলার একটি যন্ত্র সরকারের তরফ থেকে উপহার পেয়েছেন।

এরপর কী করতে চান—জানতে চাইলে মায়ারানী বলেন, ‘আসলে পরিকল্পনা করে কোনো কিছু করিনি। গরুর সংখ্যা বেড়েছে, একটি করে শেড বাড়িয়েছি। জমিও একটু একটু করে বেড়েছে। এভাবেই চলতে থাকবে। আমাদের গ্রামে এখন পাঁচ শতাধিক নারী কৃষিকাজ করছেন। অনেকেই বলে এটা নারী কৃষকের গ্রাম। এতে আমার কিছু অবদান আছে। আগে আমি পরামর্শের জন্য মানুষের কাছে যেতাম, এখন অনেক মানুষ আমার পরামর্শ নিতে আসে। এটাই আমার ভালো লাগে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Error Problem Solved and footer edited { Trust Soft BD }
More News Of This Category
Web Design By Best Web BD