বাংলাদেশকে অনেকে ছোট দেশ বলেন। এর আয়তন পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে ছোট হলেও অনেক কারণেই এটি একটি বড় দেশ। লোকসংখ্যার জন্য বড়। কৃষির নিবিড়তা এবং বৈচিত্রের জন্য বড়। মাটির উর্বরা শক্তির কারণে প্রকৃতিগতভাবে এর জীবনী শক্তি অনেক। জীব বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির প্রধান প্রাণ দেশটি। আমাদের বিশাল কৃষক পরিবার। যারা বার বার প্রাকৃতিক বড় বড় বিপর্যয়ের পরে নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে এটিকে পুনর্জীবিত করে চলেছে হাজার বছর ধরে। এই শক্তির কারণেই আমরা দেখি ধান, আলু, সবজি, ফল, পাট, মাছ চাষে আমরা পৃথিবীর সেরা দেশের একটি। এটা কম বিস্ময় নয়।
১৮ কোটি মানুষ ছোট একটা দেশে সব সম্ভব করে তুলছে। এই সব সম্ভবের দেশের কৃষির সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে আমাদের সামনে হাজির আবহাওয়া এবং এর নিয়ন্ত্রণহীন বিপর্যয় সৃষ্টি করার ক্ষমতা। এর দ্রুত পরিবর্তিত রূপ। আমাদের জন্য এর সব ধরনের হুমকি সব মৌসুমের জন্য হাজির। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, লবণাক্ততা, খরা, ঝড়, অতি বৃষ্টি, অনা বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, হিম প্রবাহ, সবই আছে। নতুন ধরনের পরিবর্তন হোল এর দ্রুত পরিবর্তনশীল রূপ, যখন যা হওয়ার কথা হয় না, অসময়ে হয়। ছয় ঋতু খুজে পাওয়া কঠিন। এরপরও সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। প্রযুক্তি মানব সভ্যতাকে গুহা মানব থেকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
বর্তমান শতকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো বায়োটেকনোলজি। বায়োটেকনোলজি হলো জীবন্ত ক্ষুদ্রাণুকে কাজে লাগিয়ে তাদের বিভিন্ন উপাদানে রূপান্তরের মাধ্যমে বাণিজ্যিক দ্রব্য মানব কল্যাণে ব্যবহার করা। উদ্ভিদ সম্পদের উন্নয়ন এবং উদ্ভিদ থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ, নতুন নতুন রোগ প্রতিরোধক্ষম প্রজাতির উদ্ভাবন। প্রজাতির উন্নয়ন ও উদ্ভিদ বৈচিত্র সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয় এর আওতাভুক্ত। উদ্ভিদে জৈব প্রযুক্তি সবচেয়ে আলোচিত ও প্রয়োগিক দিক হলো টিস্যু কালচার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা বীজহীন ফল উৎপাদন ও যে সব ফসলের বীজ হয় না সেগুলো উৎপাদন করতে পারি। এই টিস্যু কালচারের উপর ভিত্তি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্লান্ট শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
পৃথিবীর অন্যতম সমস্যা হলো পরিবেশ দূষণ। আর পরিবেশ দূষণ কমানো যায় পরিবেশ জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে, পরিবেশবান্ধব কৃষি ওষুধ, কীটনাশক ও জীবাণু সারের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে। তাই পৃথিবীব্যাপী কেমিক্যাল পেসটিসাইডের পরিবর্তে বায়োপেসটিসাইডের ব্যবহার বাড়ছে। বায়োটেকনোলজির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ক্লোনিং-এর মাধ্যমে উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রতিরূপ তৈরি এবং জীন ম্যাপের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। ফলে পছন্দসই বৈশিষ্ট্যে উদ্ভিদ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বায়োটেকনোলজি নিয়ে গবেষণা চলছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা, প্রধান রপ্তানি চিংড়ির ভাইরাস, সুন্দরবনের প্রাণীবৈচিত্র রক্ষা ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে পারে বায়োটেকনোলজি। বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে কৃষি বিজ্ঞান ও কৃষি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আশার কথা, বর্তমান সরকার কৃষি খাতে এআই ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
সরকার কৃষিকে সনাতনী ও শ্রমনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বের করে গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে একটি প্রযুক্তি নির্ভর, লাভজনক, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ‘কৃষিকে ডিজিটাল এবং প্রযুক্তি নির্ভর করতে কৃষি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করছে। কৃষক নিবন্ধন, কৃষক ডাটাবেজ, ডিজিটাল কৃষি সেবা, মোবাইল ভিত্তিক আবহাওয়া তথ্য, বাজার তথ্য, কৃষি পরামর্শ, ই-এক্সটেনশন সেবার সম্প্রসারণ এবং কৃষি সেবার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ এরই মধ্যে ‘কৃষকের ডিজিটাল ডাটাবেজ ও সরকারি সেবা কৃষকের নিকট, সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লক্ষ কৃষককে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, শ্রম সংকট মোকাবিলা এবং কৃষিকে লাভজনক করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ করছে সরকার। ‘কৃষি শিল্পের আধুনিকায়নে সরকার কৃষিতে রিমোট সেন্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ড্রোন প্রযুক্তি, জিআইএস, স্যাটেলাইট তথ্য, বিগ ডাটা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের স্বাস্থ্য ও ফলন পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ, সুনির্দিষ্ট সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন পরিকল্পনা অধিক কার্যকর ও বিজ্ঞান ভিত্তিক হবে।’
আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্য নির্ভর প্রিসিশন এগ্রিকালচার চালু করে উৎপাদন খরচ কমানো ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি করতে তৎপর সরকার। ‘সুষম, নিরাপদ ও পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষি খাতকে পুনর্বিন্যাস ও বিকশিত করা হবে। ‘দেশের কোন এলাকায় কোন সময় কোন ফসল ভালো হবে; কি পরিমাণ সার লাগবে; আবহাওয়ার পূর্বাভাস ইত্যাদি সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এমনকি রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার, বায়োফার্টিলাইজার এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষিকে জলবায়ু-স্মার্ট ও অভিযোজনক্ষম খাতে রূপান্তর করে, সরকারের নানা পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে কৃষি আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক, রপ্তানিমুখী এবং টেকসই খাতে পরিণত হচ্ছে। যা জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’ এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও উন্নত গবেষণাগার। সব সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজি এগিয়ে যাবে এটি সবার প্রত্যাশা ।