ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নয়নপুর গ্রামের হাফেজ রোকনউদ্দিনের জীবন বদলে দিয়েছে লটকন চাষ। একসময় দেশের বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও আজ তিনি ৪ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন লটকনের দুটি বাণিজ্যিক বাগান। ফল বিক্রির পাশাপাশি উন্নত জাতের কলম উৎপাদন করেও বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। তার উদ্ভাবিত একটি উন্নত জাত স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছে ‘নয়নপুরী লটকন’ নামে।
ভালুকার নয়নপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি লটকন গাছ ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা লটকন। মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা বাগানে এসে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে উন্নত জাতের কলম সংগ্রহ করতে ভিড় করছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা।
হাফেজ রোকনউদ্দিন জানান, ২০১৮ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে মাত্র ৩০টি লটকনের চারা কিনে যাত্রা শুরু করেন। পরে একটি পুরোনো বাগান যুক্ত করে প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন। তবে শুরুতে অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় আশানুরূপ ফলন পাননি। এরপর নিজেই কলম তৈরির কৌশল শিখে ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২৩ সাল থেকে সফলতা আসতে শুরু করে। চলতি মৌসুমে সেই সফলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ‘গত ৮ বছরে ৮ থেকে ১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছি। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাত সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল বড়, খেতে খুবই মিষ্টি এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। শুরুতে ব্যর্থ হয়েছিলাম কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমি চাই, যারা আমার কাছ থেকে চারা নেবেন; তারাও যেন লাভবান হন। তাই পরীক্ষিত গাছ থেকেই কলম তৈরি করি।’
উন্নত জাতটির নামকরণের পেছনেও আছে একটি বিশেষ গল্প। চলতি বছর কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ তার বাগান পরিদর্শনে গিয়ে গ্রামের নাম অনুসারে জাতটির নাম ‘নয়নপুরী লটকন’ রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই পরিচিতি পায় জাতটি।
বর্তমানে তার এক বছরের কলমের চারা ১০০ টাকা এবং দেড় থেকে দুই বছরের কলম ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা এসব কলম সংগ্রহ করেন। শুধু কলম বিক্রি করেই বছরে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করেন তিনি।
এদিকে চলতি মৌসুমে তার বাগানের লটকন প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি হয়েছে। মৌসুমের বাকি সময়ে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের ফলও পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাত করেন।
গফরগাঁও থেকে বাগান দেখতে আসা কৃষক মো. এনামুল হক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ভিডিও দেখে এসেছি। ফল খেয়ে ভালো লেগেছে। তাই ৩২টি কলম কিনেছি। ফলন ভালো হলে আমিও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।’
স্থানীয় কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘রোকনউদ্দিনের লটকনের ফল বড়, সুস্বাদু এবং দেখতে আকর্ষণীয়। তাই তার উৎপাদিত চারার ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।’
ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপজেলার প্রায় ৫ হেক্টর জমিতে বর্তমানে লটকন চাষ হচ্ছে। রোকনউদ্দিন উন্নত মানের লটকনের চারা উৎপাদন করছেন। তার উৎপাদিত ফলও অত্যন্ত সুস্বাদু। ভালো মানের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে ভালুকার লটকন দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে।’