গ্রীষ্মের শুরুতেই নড়াইলে ফুটেছে আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া। তপ্ত রোদ আর শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যেও প্রকৃতিতে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। কৃষ্ণচূড়ার রঙিন ছোঁয়ায় গ্রীষ্মের প্রকৃতি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত। প্রকৃতির এই চোখজুড়ানো সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন শিক্ষার্থী, পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা, ফুলপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
জানা গেছে, কৃষ্ণচূড়া গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া। এটি একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। ফ্যাবেসি পরিবারের অন্তর্গত শোভাবর্ধক বৃক্ষ। এই গাছ চমৎকার পত্র-পল্লব এবং আগুনলাল ফুলের জন্য প্রসিদ্ধ। এটি আগুনচূড়া, লালচূড়া বা গুলমোহর নামেও পরিচিত। কৃষ্ণচূড়া ফুল সাধারণত উজ্জ্বল লাল বা গাঢ় লাল রঙের হয়, যা দূর থেকে আগুনের শিখার মতো দেখায়। তবে এদের মধ্যে কমলা এবং হলুদ রঙের বৈচিত্র্যের প্রজাতিও দেখতে পাওয়া যায়। এ ফুলে পাঁচটি পাপড়ি থাকে। কৃষ্ণচূড়া সাধারণত বসন্তের শেষদিকে ও গ্রীষ্মের শুরুতে প্রস্ফুটিত হয়ে প্রকৃতিকে উজ্জ্বল রঙে রাঙিয়ে তোলে।
সরেজমিনে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়ির আশপাশের কৃষ্ণচূড়া গাছজুড়ে ফুটেছে গাঢ় লাল রঙের ফুল। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে সবুজ প্রকৃতি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকে যেন লাল আগুন জ্বলে উঠেছে। নজরকাড়া সৌন্দর্য নিয়ে ফোটা এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন সব বয়সী মানুষ। ফুলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে কেউ কেউ স্মৃতি ধরে রাখছেন। কেউবা আবার ফুলসমেত নিজেকে ক্যামেরাবন্দি করছেন। কিশোরী-তরুণীরা সৌন্দর্য বাড়াতে এ ফুল খোঁপায় ও বেনিতে ব্যবহার করছেন। শিশুদের হাতেও শোভা পাচ্ছে।
ফুলপ্রেমী মৌসুমি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া ফুল ফুটলে মনে হয় গ্রীষ্ম সত্যিই এসে গেছে। এই ফুলের রং আর সৌন্দর্য আমাদের মন ভালো করে দেয়। ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলে এক ধরনের প্রশান্তি পাওয়া যায়। এ সময়টায় বাইরে গেলেই যত্রতত্র চোখে পড়ে কৃষ্ণচূড়ার রঙিন ফুল।’
ধোপাখোলা গ্রামের বাসিন্দা মিম খাতুন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। এসব গাছে যখন ফুল ফোটে; তখন পুরো পরিবেশ যেন রঙিন হয়ে ওঠে। কৃষ্ণচূড়ার রঙিন এ দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণ-তরুণীরা এ সময় গাছের নিচে ছবি তুলতে বেশি আগ্রহী হয়।’
কলেজের প্রভাষক প্রফুল্ল কুমার বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া শুধু একটি ফুল নয়, এটি আমাদের আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে। এ সময়টায় প্রতিটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। চলতি পথে এ ফুল চোখ কেড়ে নেয়, ভরিয়ে দেয় মন। যে কোনো বয়সী মানুষই এর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আমাদের কলেজের প্রধান ফটকের সামনেও একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। আমরা এর সৌন্দর্য উপভোগ করি।’
লোহাগড়া সরকারি আদর্শ কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের নড়াইল জেলার সহ সমন্বয়ক কামরুন্নাহার লীনা বলেন, ‘শুধু সৌন্দর্য নয়, কৃষ্ণচূড়া গাছ পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ গাছ ছায়া দেয় এবং গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে পথচারীদের কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। এ ফুলের সৌন্দর্যে প্রকৃতিও সেজে উঠেছে অপরূপ সাজে।’
পরিবেশ কর্মী ও গ্রিন ভয়েসের সদস্য সোহেল রানা লাক্সমী বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া ফুল আমার একটা প্রিয়। এর সৌন্দর্য আমাকে বিমোহিত করে। তবে প্রকৃতি থেকে দিনদিন এ গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই নতুন করে কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই।’
পরিবেশ কর্মী ও গ্রিন ভয়েসের উপদেষ্টা সদস্য লোহাগড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম হায়াতুজ্জামান বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়ার সৌন্দর্য সবাইকে টানছে। বিশেষ করে ফুলের ওপর রোদ পড়লে এর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়। আসা-যাওয়ার পথে এ ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই।’
লোহাগড়ার দিঘলিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোশাররফ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এর কিছু ঔষধি গুণাগুণও আছে। ইউনানি চিকিৎসাশাস্ত্রে কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতা ও ফুল বিভিন্ন ভেষজ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে শরীরের প্রদাহ কমানো, ক্ষত শুকানো এবং কিছু ত্বকের সমস্যায় এর নির্যাস উপকারী বলে বিবেচিত।’
তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে এ ধরনের গাছপালা মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষ রোপণে যার যার জায়গা থেকে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।’
Leave a Reply