1. admin@ritekrishi.com : ritekrishi :
  2. ritekrishi@gmail.com : ritekrishi01 :
সবুজ বাংলাদেশ গড়তে পরিবেশ সুরক্ষার বিকল্প নেই
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

সবুজ বাংলাদেশ গড়তে পরিবেশ সুরক্ষার বিকল্প নেই

  • আপডেটের সময় : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ৯ পড়া হয়েছে

ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির

প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য নয় বরং আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যেতে পারছি? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের পরিবেশ আজ বহুমাত্রিক সংকটের মুখে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, প্ল্যাস্টিক বর্জ্য, ই-বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; তেমনই বাড়ছে নানা রোগ, অকালমৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি আজ আর শুধু প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয় নয়। এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্ন।
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকিগুলোর একটি হলো বায়ুদূষণ। আন্তর্জাতিক বায়ু মান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গড় পিএম২.৫ মাত্রা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ মানের বহুগুণ বেশি। ঢাকার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের নির্গমন, শিল্পকারখানার দূষণ, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, ইটভাটার ধোঁয়া এবং খোলা স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বায়ুদূষণের প্রধান উৎস। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো বিপুল সংখ্যক পুরোনো বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে, যেগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া প্রতিদিনই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।

বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। দূষিত বায়ুর কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ, নিউমোনিয়া এবং ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণ বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কয়েক বছর পর্যন্ত কমিয়ে দিচ্ছে। তাই বায়ুদূষণ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি এখন একটি জাতীয় উন্নয়ন সংকটে পরিণত হয়েছে।
বায়ুদূষণের আরেকটি অবহেলিত উৎস হলো তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। ধূমপানের ফলে শুধু ধূমপায়ী নয়, আশপাশের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজারো বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যার অনেকগুলো ক্যানসার সৃষ্টিকারী। অন্যদিকে সিগারেটের ফিল্টার পৃথিবীর অন্যতম বেশি ফেলে দেওয়া প্ল্যাস্টিক বর্জ্য। যা মাটি, নদী ও জলাশয়ে জমা হয়ে পরিবেশ দূষণ বাড়ায় এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।

পানিদূষণের চিত্রও সমানভাবে উদ্বেগজনক। একসময় যে নদীগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনের কেন্দ্র ছিল; সেগুলোর অনেকগুলো আজ শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যের ভারে বিপর্যস্ত। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নদীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আর্সেনিক দূষণ এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে ক্যানসার, চর্মরোগ, কিডনি রোগসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

প্ল্যাস্টিক দূষণ বর্তমানে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাস্টিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশে বর্জ্যের চাপ বাড়ছে। নদী ও সমুদ্রে পৌঁছানো এসব প্ল্যাস্টিক ধীরে ধীরে মাইক্রোপ্ল্যাস্টিকে পরিণত হয় এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানবস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। খোলা স্থানে প্ল্যাস্টিক পোড়ানোর ফলে ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ব্যাটারি ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় সীসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। একইভাবে হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে উৎপন্ন মেডিকেল বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাস্টিক পণ্য, অটোরিকশার সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি, শিল্পকারখানার মেশিনারির ব্যাটারি এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক বর্জ্য অনেক ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা ছাড়াই পুনর্ব্যবহার করা হয়। খোলা পরিবেশে প্ল্যাস্টিক গলানো কিংবা ব্যাটারি ভেঙে মূল্যবান উপাদান সংগ্রহের ফলে সীসা, অ্যাসিড ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এখনো দেশে পরিবেশসম্মত ও আধুনিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট উন্নত নয়। ফলে এসব কার্যক্রম পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের পরিবেশ সংকটকে আরও তীব্র করছে বন উজাড় ও পাহাড় ধ্বংস। দেশের বনভূমির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য অঞ্চলে অব্যাহত পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধস, বন্যা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়ছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা দেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে খরার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে।

পরিবেশদূষণের অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। দূষণজনিত অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, কর্মক্ষমতা কমছে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে পরিবেশ রক্ষা কেবল প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ রক্ষারও পূর্বশর্ত।

এ বাস্তবতায় পরিবেশ সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। শিল্পকারখানায় কার্যকর বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ই-বর্জ্য ও মেডিকেল বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খোলা স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা, প্ল্যাস্টিকের ব্যবহার কমানো, তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং দূষণকারী পুরোনো যানবাহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ আইন কার্যকর বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। গাছ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, বায়ুদূষণ কমায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে। শহর, গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। বিশেষ করে পাহাড় কাটা বন্ধ করে সেখানে পরিকল্পিত বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।

পরিবেশ রক্ষা মানে শুধু গাছ, নদী বা পাহাড় রক্ষা নয়। পরিবেশ রক্ষা মানে মানুষের জীবন রক্ষা। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে পানি পান করি এবং যে মাটিতে খাদ্য উৎপাদন করি, তার সুরক্ষাই আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার ভিত্তি। আজ যদি আমরা পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল না হই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক–দূষণ কমাই, গাছ লাগাই, বন রক্ষা করি, পাহাড় ধ্বংস বন্ধ করি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তুলি। কারণ একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পরিবেশ সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Error Problem Solved and footer edited { Trust Soft BD }
More News Of This Category
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত - রাইট কৃষি-২০২১-২০২৪
Web Design By Best Web BD