মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত গ্রাফটিং বা জোড় কলমের টমেটো চারা এখন সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতিমৌসুমে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ চারা বিক্রির মাধ্যমে অঞ্চলটিতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার অর্থ লেনদেন হচ্ছে।
কমলগঞ্জের আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব চারার নার্সারি। সারি সারি চারার মাঝে হাতে ব্লেড নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। নিখুঁতভাবে তিতবেগুন বা বনবেগুনের শক্ত শেকড়ের অংশের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন টমেটোর ওপরের অংশ। ছোট্ট এই জোড়ায় তৈরি করছে শক্তিশালী গ্রাফটিং চারা।
নার্সারি উদ্যোক্তারা জানান, প্রথমে তিতবেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা তৈরি করা হয়। তিতবেগুনের চারা উপযুক্ত হতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা তৈরি হতে প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। এরপর স্বাস্থ্যবান চারা বাছাই করে গ্রাফটিং করা হয়। জোড়ার স্থান বিশেষ পলিথিন দিয়ে বাঁধার পর তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুটি অংশ জোড়া লাগে। পরে আরও ১০ থেকে ১২ দিন পরিচর্যার ঘরে রেখে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিটি গ্রাফটিং চারা বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে। এ কাজে যুক্ত শ্রমিকদেরও তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান। একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে ১০০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা জোড়া লাগাতে পারেন।
স্থানীয় কৃষক এম এ করিম জানান, ‘বনবেগুন টমেটোর একটি জংলি জাত, গ্রাম-গঞ্জে এ বেগুনের হরেক নাম। এই বেগুন চারার গোড়ার দিকের অংশের সঙ্গে টমেটোর চারার ওপরের দিকের অংশ জোড়া দিয়ে করা হয় গ্রাফটিং। এভাবে লাগানো টমেটোর চারা বড় হয়ে ঢলে পড়ে না, রোগবালাইও তেমন হয় না। উপরন্তু ফলন মেলে প্রচুর। যেখানে সাধারণ একটি গাছে পাঁচ-দশ কেজি টমেটো মেলে, সেখানে গ্রাফটিং করা প্রতিগাছে মেলে বিশ থেকে পঁচিশ কেজি।’
গ্রাফটিং করা টমেটো গাছ পানি সহনীয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই কারণে ভারী বৃষ্টিতেও এই টমেটোগাছ নষ্ট হয় না। গ্রাফটিং চারার চাহিদা অনেক। নিজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ দেশের আরো আট থেকে দশটি জেলায় সরবরাহ করি। অনেকে মৌসুমের আগেই চারার সংখ্যা জানিয়ে অর্ডার দেন। তাদেরকে সময়মতো সরবরাহ করতে হিমশিম খাই।’
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলায় প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন হচ্ছে। এসব চারা মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হচ্ছে। এ খাত থেকে এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার লেনদেন হয়।’
তিনি জানান, কমলগঞ্জে চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে। এ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৪৮০ জন কৃষক। দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা গ্রাফটিং চারার জন্য যোগাযোগ করছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।