স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আসছে বড় পরিবর্তন। ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি এড়াতে মানুষ এখন চিনির প্রাকৃতিক ও নিরাপদ বিকল্প খুঁজছেন। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাটে শুরু হয়েছে ‘স্টিভিয়া’ বা ‘চিনি পাতা’র বাণিজ্যিক চাষ। কম খরচে ও সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষযোগ্য এই ভেষজ উদ্ভিদটি কৃষির নতুন এক অর্থকরী ফসল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম এলাকায় এই চাষাবাদে সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় কৃষক আব্দুল আলিম। তার দেখানো পথে অনেকেই এখন এই ‘মধু পাতা’ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
গবেষকদের মতে, স্টিভিয়া গাছের শুকনো পাতা সাধারণ চিনির চেয়ে বহুগুণ মিষ্টি। এক কেজি শুকনো পাতা প্রায় ৪০ কেজি চিনির মিষ্টতার সমান কাজ করে। প্রক্রিয়াজাত করে পাউডার বানালে তা চিনির চেয়ে ৫০-৬০ গুণ এবং নির্যাস তৈরি করলে ৩০০ থেকে ৪০০ গুণ পর্যন্ত বেশি মিষ্টি হয়। চা, কফি, পায়েস কিংবা যে কোনো মিষ্টি খাবারে চিনির স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যায়। এতে ক্যালরি না থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
দহগ্রামের সফল উদ্যোক্তা ও ‘দহগ্রাম এগ্রো ফার্ম’ এর স্বত্বাধিকারী আব্দুল আলিম জানান, এক শিক্ষকের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্টিভিয়া পাউডার খুঁজতে গিয়ে তিনি ভারতে যান। সেখানে এই ফসলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং দেশে ফেরার সময় কিছু চারা নিয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি ১২ শতাংশ জমিতে স্টিভিয়া চাষ করছেন। তিনি বলেন, আমি এখন নিজেই চারা উৎপাদন করছি। আমার খামারে দুজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানও হয়েছে। আমার কাছ থেকে চারা কিনে অনেকেই এখন স্টিভিয়া চাষে ঝুঁকছেন।
আব্দুল আলিম জানান, স্টিভিয়া চাষে খরচ তুলনামূলক কম। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে শুধুমাত্র জৈব সার ব্যবহার করে তিনি ৪৫ দিন পরপর প্রায় ২৫ কেজি শুকনো পাতা সংগ্রহ করেন। মাত্র ১২ শতাংশ জমি থেকে তিনি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টিভিয়া চাষে রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই জৈব সারই এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী। হেক্টরপ্রতি এই ফসল থেকে বছরে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
লালমনিরহাটের আবহাওয়া ও মাটি স্টিভিয়া চাষের জন্য বেশ উপযোগী বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এটি কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক এবং আগামীর সম্ভাবনাময় ফসল।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, নতুন উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে স্টিভিয়াকে জনপ্রিয় করতে আমরা কাজ করছি। নতুন উদ্যোক্তাদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
Leave a Reply