মো. হেফাজ উদ্দিন
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকসমাজ জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই যে মানুষগুলো মাঠের পথে হাঁটেন, রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে ফসল ফলান, দেশের কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করেন। অথচ পরিহাসের বিষয়, ফসল ঘরে তোলার পর সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় কৃষকদের। তারপরও বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃষির প্রতি আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
বর্তমান সময়ে কৃষকের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু উৎপাদন নয়, উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য প্রাপ্তি। বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ে না কৃষিপণ্যের দাম। অনেক সময় কৃষক বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করেন। অন্যদিকে একই পণ্য শহরের বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এই বৈষম্য কৃষকের প্রতি এক ধরনের নীরব অবিচার।
কৃষিকে লাভজনক করতে হলে কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্য পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প নেই। সরকারকে আধুনিক সংরক্ষণাগার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, সরাসরি বাজারব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বিপণন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতি মুনাফার প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষি আজ নানা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত বীজ এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রমে খাদ্য উৎপাদনে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন কৃষক তার শ্রমের যথার্থ প্রতিদান পাবেন।
কৃষকের মুখে হাসি না ফুটলে দেশের উন্নয়নের গল্প কখনো পূর্ণতা পাবে না। যে হাত আমাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা দেয়, সেই হাত যেন হতাশায় ঝরে না পড়ে। কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু কৃষকের প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া নয়; বরং একটি জাতির খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে সুরক্ষিত করা। কৃষকের ঘামের মূল্য যেন বাজারের দরদামে হারিয়ে না যায়। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হোক, কৃষকের জীবন হোক মর্যাদাপূর্ণ ও স্বপ্নময়।
Leave a Reply